Friday, 27 March 2026

ঈদ উল ফিতর ২০২৬

 ঈদের আনন্দ মানেই পরিবার, ভালোবাসা আর একসাথে কাটানো কিছু অমূল্য সময়। তবে এই ঈদটা যেন আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় এক অধ্যায় হয়ে থাকবে—কারণ এই ঈদে আমরা শুধু উৎসবই করিনি, বরং একসাথে কাটিয়েছি এক টুকরো জীবনের গল্প।

১৮ মার্চ রাত ঠিক ১২টা। চারপাশে তখন নিস্তব্ধতা, কিন্তু আমাদের ঘরে যেন উৎসবের আগাম প্রস্তুতি। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুলতেই দেখি—ছোটবোন শেলী, তার স্বামী বাবু আর তাদের ছোট ছেলে মুক্তাদির। ক্লান্ত চোখে ভ্রমণের ছাপ থাকলেও মুখভরা হাসি সব ক্লান্তিকে হার মানিয়েছে। তাদের আগমনে ঘরটা মুহূর্তেই প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো। আমার স্ত্রী সাথী আর মেয়ে নিসাও যেন নতুন করে আনন্দ খুঁজে পেলো।

পরদিন তারা আরেক ছোটবোন সম্পার বাসায় গেলেও, ঈদের আগেই আবার ফিরে এলো আমাদের কাছে। সেই সময়টুকুতে ঘরের প্রতিটি কোণে ছিল হাসি, গল্প আর ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত।

ঈদের সকালটা শুরু হলো এক অন্যরকম অনুভূতি দিয়ে। আমরা সবাই মিলে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ-এ ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করলাম। হাজারো মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে যখন একসাথে তাকবির ধ্বনি উঠছিল, তখন মনে হচ্ছিল—আমরা সবাই এক, একই আনন্দে বাঁধা। নামাজ শেষে আলিঙ্গন, শুভেচ্ছা আর হাসিমাখা মুখ—সব মিলিয়ে ঈদের প্রকৃত আনন্দ যেন সেদিনই উপলব্ধি করলাম।

ঈদের পরদিন শুরু হলো আমাদের বহুল প্রতীক্ষিত ভ্রমণ—গন্তব্য কক্সবাজার। ট্রেনের কেবিনে বসে গল্প, আড্ডা, হাসি—সময় যেন উড়ে যাচ্ছিল। জানালার বাইরে ছুটে চলা প্রকৃতি আর ভেতরে আমাদের আনন্দ—দুই মিলে যেন এক অপূর্ব মুহূর্ত তৈরি করেছিল।

কক্সবাজার পৌঁছে উঠলাম আগে থেকেই বুকিং করা নিলিমা রিসোর্টে। সাগরের গর্জন, হালকা বাতাস আর পরিবারের সাথে কাটানো সময়—এই দুই দিন যেন স্বপ্নের মতো কেটে গেল। আমরা সবাই মিলে সাগরে ভিজলাম, বালুর ওপর হাঁটলাম, ছবি তুললাম—প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠলো স্মৃতির একেকটি রঙিন ফ্রেম।

দ্বিতীয় দিনটা ছিল আরও বেশি রোমাঞ্চে ভরা। চান্দের গাড়িতে চড়ে আমরা ঘুরে এলাম শাহপরীর দ্বীপ, টেকনাফ, উখিয়া, রামু এবং বিখ্যাত মেরিন ড্রাইভ। সাগরের ধারে দীর্ঘ রাস্তা, পাহাড় আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করে দিয়েছিল। প্রতিটি জায়গায় আমরা থেমেছি, দেখেছি, অনুভব করেছি—আর জমা করেছি অসংখ্য স্মৃতি।

কিন্তু সুখের এই ভ্রমণের মাঝেই হঠাৎ করে শুরু হলো বাস্তবতার পরীক্ষা। ফেরার জন্য ট্রেনের টিকেট বুকিং করা হলেও, যার মাধ্যমে করা হয়েছিল, সে আর ফোন ধরছিল না। অনেক চেষ্টা করেও যখন কোনো সমাধান হলো না, তখন শেলীরা অনলাইনে কষ্ট করে মাত্র দুইটি টিকেট জোগাড় করতে পারলো। তাই তারা ট্রেনে ঢাকায় ফিরে গেল, আর আমরা থেকে গেলাম কক্সবাজারে—একটু দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে।

হোটেল বুকিং না থাকায় কিছুটা বিপাকে পড়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহর রহমতে এক বন্ধুর সহায়তায় একটি হোটেলে রুম পেয়ে গেলাম। তখন মনে হলো—কষ্টের মাঝেও যেন স্বস্তির একটুখানি আলো থাকে।

পরদিন বাসে ফেরার পরিকল্পনা। আগের দিনই সকাল ১১টার টিকেট কেটে রেখেছিলাম। কিন্তু সকালে প্রস্তুত হওয়ার মাঝেই খবর এলো—বাস এখনো পৌঁছায়নি, অন্তত দুই ঘণ্টা দেরি হবে। হোটেল ছেড়ে আমরা রিসেপশনে বসে রইলাম। সময় যেন কাটতেই চাইছিল না। অবশেষে চার ঘণ্টা পর বাস ছাড়লো।

কিন্তু সেখানেই শেষ নয়—পথজুড়ে ভয়াবহ জ্যাম, আর বারবার জ্বালানি নেওয়ার জন্য থামা। পুরো যাত্রাপথে পাঁচবার তেল নিতে হয়েছে বাসটিকে। ক্লান্তি, বিরক্তি—সব মিলিয়ে এক কঠিন অভিজ্ঞতা। তবুও আমরা একসাথে ছিলাম, গল্প করেছি, হাসার চেষ্টা করেছি—এটাই ছিল সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টার ক্লান্তিকর যাত্রা শেষে ভোর ৫টায় ঢাকায় পৌঁছালাম। শরীর ক্লান্ত ছিল, কিন্তু মন ভরা ছিল এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে।

এই ভ্রমণে কষ্ট ছিল, ঝামেলা ছিল, অনিশ্চয়তা ছিল—কিন্তু তার থেকেও বেশি ছিল ভালোবাসা, একসাথে থাকার আনন্দ আর স্মৃতির ভাণ্ডার।

শেষ পর্যন্ত বুঝলাম—ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য শুধু গন্তব্যে নয়, বরং প্রতিটি পথে, প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি ছোট ছোট মুহূর্তে লুকিয়ে থাকে। আর সেই মুহূর্তগুলোই একসময় হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্প।

No comments:

Post a Comment

ঈদ উল ফিতর ২০২৬

 ঈদের আনন্দ মানেই পরিবার, ভালোবাসা আর একসাথে কাটানো কিছু অমূল্য সময়। তবে এই ঈদটা যেন আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় এক অধ্যায় হয়ে থাকবে—কারণ এই ...